সুন্দরী মডেলের অপহরণ চক্র

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুরাইয়া নীল। ২০ বছর বয়সী এই তরুণী র‌্যাম্প মডেল হিসেবে পরিচিত। অভিনয় করেছেন টিভি নাটক ও সিরিয়ালে। নাটকে তাকে বিভিন্ন চরিত্রে দেখা গেছে। তবে বাস্তবের চরিত্র ভয়ঙ্কর। রাতারাতি বিপুল অর্থের মালিক হতে বেছে নেন ভিন্নপথ। ব্ল্যাকমেইল থেকে শুরু করে মাদক বাণিজ্য। অপকর্মে ষোলআনা পূরণ করতে এই মডেল গড়ে তুলেছেন এক অপহরণকারী চক্র।

তার বান্ধবী রাবেয়া সুলতানা রিতুর স্বামীকে জিম্মি করে চেয়েছিলেন বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করতে। হবু স্ত্রী রিতুর সঙ্গেই আইনজীবী আবু হেনা মোস্তফা গিয়েছিলেন মডেল কন্যা নীলের বাসায়। সেখানেই ঘটে ঘটনাটি। ফিল্মি স্টাইলে জিম্মি করা হয় তাকে। টিভিতে ক্রাইম পেট্রোল দেখেই এ রকম পরিকল্পনা করে মডেল নীল ও তার সহযোগীরা। আবু হেনা মোস্তফাকে জিম্মি করে দাবি করা হয় ৩০ লাখ টাকা। ঘটনাটি ঘটেছে যশোর জেলার অভয়নগর থানার একতাপুরে। তবে এর শেষ রক্ষা হয়নি। পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)’র অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছে সুরাইয়া নীলসহ এই চক্রের তিন সদস্য।

গত ৬ই ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরা থেকে খুলনায় যান আবু হেনা মোস্তফা। উদ্দেশ্য হবু স্ত্রী রিতুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করা। রিতু তাকে খুলনা পাইওনিয়ার কলেজের সামনে যেতে বলেন। সেখানেই দেখা হয় তাদের। খুলনা এলাকায় অবস্থানকালে রেস্টুরেন্টে বসে ফোনে কথা হয় রিতুর বান্ধবী নীলের সঙ্গে। মডেল নীল বাসায় আমন্ত্রণ করেন হবু দম্পতিকে। আবু হেনা মোস্তফা অচেনা কারও বাসায় যেতে আগ্রহী না। মডেল নীল তাকে দুলাভাই সম্বোধন করে জানান, এতো কাছে এসে চলে যাবেন শ্যালিকাকে দেখবেন না, তাতো হয় না। মোস্তফা জানান, অন্য একদিন আসবেন। বাসায় যাবেন। দীর্ঘ সময় আড্ডা দেবেন। মডেল নীল নাছোড়বান্দা। এক পর্যায়ে মডেল কন্যা নিজেই উপস্থিত হন।

বান্ধবী ও তার হবু স্বামীকে বাসায় নিয়ে যেতে চান তিনি। আবু হেনা মোস্তফা ও রিতু তখন জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্ট পার্কে। অল্প সময়েই মোস্তফার কাছাকাছি যেতে চেষ্টা করেন। রিতু তার খুব কাছের বান্ধবী। সুতরাং বাসায় গিয়ে জমিয়ে আড্ডা দেবেন। রাজি হন মোস্তফা। নীলের বাসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। যশোর জেলার অভয়নগরে একতাপুর। সেখানে ভাড়া বাসায় রাজকে নিয়ে থাকেন নীল। সমবয়সী রাজকে সবাই তার স্বামী হিসেবেই জানেন।

বাসায় যাওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই ঘটে ঘটনাটি। বাসার দরজা-জানালা বন্ধ। কথা বলার মধ্যে বারবার উঠে যাচ্ছিলো নীল ও রিতু। কিছু বুঝে ওঠার আগেই হঠাৎ বদলে যায় তাদের রূপ। হঠাৎ করেই আবু হেনা মোস্তফাকে চেপে ধরে তারা। দড়ি এগিয়ে দেন মডেল নীল। মুখ চেপে ধরেন। দ্রুত মোস্তফার হাত-পা বাঁধে তারা। লুটে নেয় তার সঙ্গে থাকা সর্বস্ব। ধারালো অস্ত্র দেখিয়ে হুমকি দেয়া হয়। তারা যা বলবে তাই করতে হবে। নতুবা মেরে লাশ গুম করা হবে। সন্ধ্যায় আবু হেনা মোস্তফাকে বাধ্য করা হয় তার বন্ধুকে কল দিতে। তিনি বন্ধু হাফিজকে কল দিয়ে জানান, তিনি খুব বিপদে। এক্ষুণি টাকার দরকার। হাফিজ বিকাশে টাকা পাঠান। পরে পরিচয় গোপন করে আবু হেনা মোস্তফার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন দিয়ে পর্যায়ক্রমে তার পিতা এবং দুলাভাইকে ফোন করে ৩০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে এই চক্র। এ সময় মোস্তফাকে মারধর করে কান্নার আওয়াজ শুনানো হয় স্বজনদের। জিম্মি থেকে মারধর, মুক্তিপণ আদায় পুরো কাজটাই করছিল সুরাইয়া নীল, তার স্বামী রাজ ও চক্রের অন্যান্য সদস্যরা।

উপায়ন্তর না পেয়ে এই আইনজীবীর পরিবারের সদস্যরা আশ্রয় নেন পিবিআই’র। পরে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদারের দিক-নির্দেশনায় পিবিআই যশোর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিনের নেতৃত্বে একটি টিম মাঠে নামে। মুক্তিপণের টাকা নেয়ার সময় গ্রেপ্তার করে চক্রের শাহীন শিকদারকে। পরে তাকে নিয়ে অভিযান চালিয়ে অভয়নগর থানার একতাপুর থেকে গ্রেপ্তার করে আব্দুস সালাম ও সুরাইয়া নীলকে। ওই বাড়ি থেকেই রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করা অপহৃত আইনজীবী আবু হেনা মোস্তফা মলিনকে। অপহরণের দুইদিন পর গত মঙ্গলবার তাকে উদ্ধার করা হয়। এক মাস আগে ওই বাড়িতে অভিযুক্ত সুরাইয়া নীল ও আব্দুস সালাম স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে ভাড়াটিয়া হিসেবে উঠেছিল।

পিবিআই জানিয়েছে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আবু হেনা মোস্তফা মলিনের সঙ্গে সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি থানাধীন প্রতাবনগর গ্রামের এসএম হারুনর রশিদের মেয়ে রাবেয়া সুলতানা রিতুর (২২) পারিবারিকভাবে বিয়ে ঠিক হয়।

রাজের বরাত দিয়ে পিবিআই জানিয়েছে, রাজ আগে একটি কোম্পানিতে চাকরি করেছে। কিন্তু চাকরি ছেড়ে দেয়ার পরপরই প্রতারক হয়ে ওঠে। মানুষকে মোটরসাইকেল কিনে দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে মোটরসাইকেল বা টাকা কোনোটাই দিতো না।

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, সুরাইয়া নীল ও রাজ অনলাইনে ‘মধুর মধু’- নামে পেইজ খুলে ফেন্সিডিল, ইয়াবা বিক্রি করতো। ওই সময় খুলনার এক ব্যক্তির সঙ্গে একটি প্রাইভেট কার নিয়ে ঝামেলা হলে তারা যশোরে এসে বাসা ভাড়া নেয়।

২৭শে জানুয়ারি রাজের জন্মদিনে মদ ইয়াবার পার্টি আয়োজন করা হয়। ওই অনুষ্ঠানে রিতুও রাতভর মদ-ইয়াবায় ডুবে থাকে। ওই রাতেই রিতু বলে এক আইনজীবীর সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়েছে। ছেলে বড়লোক। অনেক টাকা-পয়সা আছে। তাকে অপহরণ করলে অনেক টাকা পাওয়া যাবে। তখন ওই বাসায় বসেই রিতুর হবু স্বামীকে অপহরণ করার পরিকল্পনা করে তারা। রিতুর হবু স্বামীকে অপহরণ করে যে টাকা পাওয়া যাবে সেগুলো দিয়ে তারা একটি পুরাতন এলিয়ন গাড়ি কিনবে। সাজেকে ঘুরতে যাবে। তখন রিতু, রাজ ও তার চাচা সালাম মিলে মূল পরিকল্পনা করে। রিতু ছাড়া বাকি তিনজনই মূল পরিকল্পনায় ছিল। আইনজীবীকে তারা অপহরণ করে মেরে ফেলারও পরিকল্পনা করেছিল।

পিবিআই যশোর জেলা ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার রেশমা শারমিন মানবজমিনকে বলেন, সুরাইয়া নীল, রাজ, রিতু চাকচিক্য ও বেপরোয়া লাইফ কাটাতে পছন্দ করতো। কিন্তু তাদের অনেকের পরিবারের সদস্যরা এ ব্যাপারে কিছুই জানতো না। শুধু বেপরোয়া রাজের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জানতে পেরে তাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিল। রিতুর বাবাও একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। তিনি নিজে অনার্সের শিক্ষার্থী। বন্ধুর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হতেন। তারা ভুক্তভোগী আইনজীবীকে অপহরণ করে অনেক টাকা হাতিয়ে নিতে চেয়েছিলেন। তাকে মেরে ফেলারও পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু পিবিআই তার আগেই এই চক্রের রিতু ছাড়া প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার করেছে। খুব শিগগির রিতুকেও গ্রেপ্তার করা হবে। ঘটনার পর থেকে রিতু ও রাজ পলাতক রয়েছে বলে জানান তিনি। সূত্র: মানবজমিন।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

Your email address will not be published.