একাকিত্বের ভারে তারেক রহমান
শীতল কুয়াশায় মোড়া এক সকালে দেশবাসী ঘুম ভাঙতেই জানতে পারে হৃদয়বিদারক খবর। সব চিকিৎসা ও চেষ্টা ব্যর্থ করে বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মুহূর্তের মধ্যেই শোকের ছায়া নেমে আসে সারাদেশে।
এভারকেয়ার হাসপাতালে ভিড় জমান বিএনপির নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। সেখানেই আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন তার বড় ছেলে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মায়ের বিদায়ে জীবনের সবচেয়ে বড় শূন্যতার মুখে পড়েন তিনি। দেশে ফেরার মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই এমন বেদনাদায়ক ঘটনা তারেক রহমানের জীবনকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়।
লন্ডনে অবস্থানকালে মায়ের শারীরিক অবস্থার অবনতি ও হাসপাতালে যাওয়ার খবর পেয়ে তিনি গভীর মানসিক চাপে ছিলেন বলে জানা যায়। ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীদের সঙ্গেও দেখা কমিয়েছিলেন। একান্তে সময় কাটিয়ে মায়ের কথা ভাবছিলেন তিনি—দেশের গণতন্ত্র রক্ষায় খালেদা জিয়ার দীর্ঘ সংগ্রাম, আর প্রবাসে থাকায় মায়ের পাশে থাকতে না পারার কষ্ট।
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর খালেদা জিয়া যখন রাজনীতির কঠিন পথে নামেন, তখন খুব অল্প বয়সেই তারেক রহমান ছিলেন মায়ের সবচেয়ে কাছের মানুষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দেশের রাজনীতির টানাপোড়েনে জিয়া পরিবারও ভয়াবহ আঘাতের শিকার হয়।
নির্যাতন ও রাজনৈতিক প্রতিকূলতার কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তারেক রহমান। শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের একই পরিণতি ভোগ করেন তার ছোট ভাই আরাফাত রহমান কোকোও। সেই আঘাত থেকে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারেননি কোকো। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে মালয়েশিয়ায় তার মৃত্যু হয়। ভাইকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগও হয়নি তারেকের। সেই শোকে খালেদা জিয়া ভেঙে পড়েছিলেন চরমভাবে।
এরপর কারাবাস, অসুস্থতা ও দীর্ঘ চিকিৎসা—খালেদা জিয়ার জীবন পরিণত হয় একটানা সংগ্রামে। গণঅভ্যুত্থানের পর মুক্তি পেয়ে বিদেশে চিকিৎসা নিলে দল ও সমর্থকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়। ধারণা করা হচ্ছিল, তিনি সামনে থেকেই না হলেও আড়াল থেকে নেতৃত্ব দেবেন।
তবে নভেম্বরের শেষ দিক থেকে তার শারীরিক অবস্থা আবারও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। দেশের মানুষের দোয়ায় জায়গা করে নেন তিনি। বিদেশে নেওয়ার সব আয়োজন থাকলেও শারীরিক অবস্থা সেই সুযোগ দেয়নি। হয়তো নিয়তি চেয়েছিল, তার শেষ বিদায় হোক বাংলাদেশের মাটিতেই—যে দেশের জন্য তিনি আজীবন লড়েছেন।
খালেদা জিয়ার জীবনের দৃঢ় উচ্চারণ ছিল—দেশ ছেড়ে কোথাও না যাওয়ার অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার রেখেই তিনি পৃথিবী ছাড়লেন। অনেকের বিশ্বাস, তিনি অপেক্ষা করছিলেন প্রিয় পুত্র তারেকের দেশে ফেরার জন্য।
সব বাধা পেরিয়ে তারেক রহমান দেশে ফেরেন, আর সেই প্রত্যাবর্তন ঘিরে রাজধানীজুড়ে জনস্রোত দেখা যায়। দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমে তাকে ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু সেই আলোচিত প্রত্যাবর্তনের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় জীবনের আরেকটি গভীর ক্ষত নিয়ে একা হয়ে যান তিনি।
শৈশবে বাবাকে হারানো, যৌবনে ভাইকে হারানো, আর এখন মাকেও হারিয়ে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন তারেক রহমান। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়েই তিনি হয়তো অতীতের শোক ভুলে থাকতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সেই আশ্রয়টুকুও হারালেন।
এই বিদায়ের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়া হয়তো ছেলেকে একটি নীরব বার্তা দিয়ে গেছেন—সব প্রতিকূলতার মাঝেও দেশ ও মানুষের পাশে থাকার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর। একা হয়ে গেলেও সেই কঠিন পথ পাড়ি দিতেই হবে। পথ যে বন্ধুর, তা তিনি ভালো করেই জানতেন, আর সেই শক্তির কথাই হয়তো ‘আম্মা’ বলে গেছেন তার প্রিয় তারেককে।












