বিশ্বজুড়ে নিষিদ্ধ আকাশসীমা: কেন উড়তে পারে না বিমান
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন অনেক সংবেদনশীল স্থান রয়েছে, যেখানে নিরাপত্তা, সাংস্কৃতিক সুরক্ষা বা পরিবেশগত কারণে বিমান চলাচল সম্পূর্ণভাবে সীমাবদ্ধ। আশ্চর্যের বিষয় হলো—যুক্তরাষ্ট্রের ডিজনিল্যান্ড ও ডিজনি ওয়ার্ল্ডও এই তালিকার অন্তর্ভুক্ত; উভয় পার্কের ওপর দিয়ে উড্ডয়ন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।
সরকারগুলো সাধারণত স্থায়ী বা সাময়িকভাবে যে আকাশসীমাকে উড্ডয়নের বাইরে রাখে, সেটিকেই ‘নো-ফ্লাই জোন’ বলা হয়। এই ধরনের নিয়ম বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষা করা এবং সংরক্ষিত পরিবেশ বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
নো-ফ্লাই জোন বনাম নিষিদ্ধ আকাশসীমার পার্থক্য
বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ broadly দুই ভাগে বিভক্ত—‘নো-ফ্লাই জোন’ এবং ‘নিষিদ্ধ আকাশসীমা’। নো-ফ্লাই জোন সাধারণত সামরিক বা নিরাপত্তাজনিত কারণে অস্থায়ীভাবে আরোপিত হয়, বিশেষ করে সংঘাতপূর্ণ এলাকায়।
উদাহরণ:
- ২০১১ সালে লিবিয়ায় নো-ফ্লাই জোন কার্যকর।
- ২০২৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের নির্বাচনের দিন সাময়িক নো-ফ্লাই জোন।
বড় আন্তর্জাতিক আয়োজন, সম্ভাব্য সন্ত্রাসী হুমকি বা জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা ব্যবহার করা হয়।
অন্যদিকে ‘নিষিদ্ধ আকাশসীমা’ সাধারণত স্থায়ীভাবে নির্ধারণ করা হয়—এখানে কোনো বিমান ঢুকতে পারবে না। ভুলবশত ঢুকলে প্রথমে রেডিও সতর্কতা দেওয়া হয়, প্রয়োজন হলে সামরিক বাহিনী আরও কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে।
ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও পবিত্র স্থানের আকাশসীমা
অনেক বিশ্ব ঐতিহ্য ও ধর্মীয় স্থাপনার ওপর দিয়ে উড্ডয়ন বন্ধ রাখা হয়েছে, যাতে স্থাপত্য ও পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে।
- পেরুর মাচু পিচু: ২০০৬ সাল থেকে আকাশপথ সম্পূর্ণ বন্ধ, যাতে দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা ও বন্যপ্রাণী রক্ষা পায়।
- ভারতের তাজমহল: ২০১৯ সালে ইউনেসকোর ঘোষণার পর থেকে স্থায়ী নিষিদ্ধ আকাশসীমা।
এ ছাড়া নয়াদিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবন, মুম্বাইয়ের টাওয়ার অব সাইলেন্স, তিরুমালা ভেঙ্কটেশ্বরা মন্দির, গোল্ডেন টেম্পলসহ আরও অনেক পবিত্র স্থানে বিমান চলাচল সীমাবদ্ধ। - গ্রিসের পার্থেনন: এখানে ৫ হাজার ফুটের নিচে বিমান উড়তে পারে না—ঐতিহাসিক পরিবেশ রক্ষায় এই ব্যবস্থা।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সরকারি স্থাপনা
গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবন, সামরিক ঘাঁটি এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলোর ওপর দিয়ে বিমান চলাচলে কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকে।
- ওয়াশিংটন ডিসি (যুক্তরাষ্ট্র): এখানে বিশেষ ফ্লাইট রুলস এরিয়া আছে, যার ভেতরের অংশ সম্পূর্ণ ফ্লাইট-রেস্ট্রিকটেড জোন। হোয়াইট হাউসের ওপর দিয়ে উড্ডয়ন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
- ক্যাম্প ডেভিড, প্যান্টেক্স নিউক্লিয়ার অ্যাসেম্বলি প্ল্যান্ট, কিংস বে সাবমেরিন বেস, নেভাল বেস কিটসাপ—সবগুলোই সংরক্ষিত আকাশসীমা।
যুক্তরাজ্যে—
- বাকিংহাম প্যালেস,
- উইন্ডসর ক্যাসল,
- ডাউনিং স্ট্রিট,
- পার্লামেন্ট ভবন—এগুলোর ওপর দিয়ে উড্ডয়ন নিষিদ্ধ।
ইসরাইলও তার নিউক্লিয়ার রিসার্চ সেন্টার, সামরিক ঘাঁটি এবং ধর্মীয় স্থানের আকাশসীমায় কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে থাকে।
বাণিজ্যিক ও সামরিক কৌশলগত নিষেধাজ্ঞা
৯/১১-এর পর যুক্তরাষ্ট্র ডিজনিল্যান্ড ও ডিজনি ওয়ার্ল্ডকে জাতীয় প্রতিরক্ষা আকাশসীমা ঘোষণা করে। তিন মাইল ব্যাসার্ধের মধ্যে বিমান প্রবেশ নিষিদ্ধ। এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিষ্ঠানের আকাশ বিজ্ঞাপন বন্ধ রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়।
- প্যারিসে: ৬,৫০০ ফুটের নিচে বিমান চলাচল বন্ধ।
- কিউবা: অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
- চীন: তিয়েনআনমেন স্কয়ারের ওপর দিয়ে উড়তে পারে না কোনো বিমান; পাশাপাশি আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনসকে কঠোর রুট-নিয়ম মানতে হয়।
সংঘাত বা বিপদের কারণে নিষেধাজ্ঞা
- রাশিয়া-ইউক্রেন সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইউক্রেনের আকাশসীমা মূলত বেসামরিক ফ্লাইটের বাইরে রাখা হয়েছে।
- অনেক পশ্চিমা এয়ারলাইনস নিরাপত্তার জন্য রাশিয়ার আকাশসীমা এড়িয়ে চলে।
- রাজনৈতিক উত্তেজনা ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার কারণে উত্তর কোরিয়ার আকাশসীমাও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
সৌদি আরবেও মক্কা ও মদিনার আকাশসীমা পবিত্রতা ও তীর্থযাত্রীর নিরাপত্তার জন্য সীমাবদ্ধ রাখা হয়। হজ মৌসুমে কিছু ক্ষেত্রে নজরদারির জন্য হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়।



















