সংস্কার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান কেন যৌক্তিক—ব্যাখ্যা দিল অন্তর্বর্তী সরকার
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার ও প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অবস্থান গণতান্ত্রিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে জানিয়েছে সরকার। রোববার (১৮ জানুয়ারি) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রকাশিত এক ব্যাখ্যামূলক পোস্টে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।
পোস্টে বলা হয়, সাম্প্রতিক সময়ে কিছু মহল থেকে দাবি করা হয়েছে—জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়ন সংক্রান্ত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশ্য সমর্থন প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলতে পারে। তবে সরকার মনে করে, এই উদ্বেগ আলোচনার যোগ্য হলেও বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব ও আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক চর্চার আলোকে এ ধরনের সমালোচনার বাস্তব ভিত্তি নেই।
সরকারের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করা হয়, দেশের এই সংকটকালীন সময়ে নীরব থাকা নিরপেক্ষতার প্রতীক নয়; বরং তা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের ঘাটতির ইঙ্গিত দিতে পারে।
সংস্কারই অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব
ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকার কেবল দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা বা একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য গঠিত হয়নি। দীর্ঘদিনের শাসনব্যর্থতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও জনআস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়েই এই সরকার গড়ে ওঠে। এর মূল লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করা, গণতান্ত্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা এবং নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে প্রয়োজনীয় সংস্কারের একটি গ্রহণযোগ্য কাঠামো তৈরি করা।
প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস গত দেড় বছরে রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও তরুণ প্রতিনিধিদের সঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে যে সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছেন, বর্তমান সংস্কার প্যাকেজ তারই প্রতিফলন। ফলে এই সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়াকে নিরপেক্ষতা লঙ্ঘন বলা সঠিক নয় বলে মনে করে সরকার।
গণতন্ত্রে নেতৃত্বের অবস্থান স্বাভাবিক
সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক গণতান্ত্রিক রীতিতে অন্তর্বর্তী বা নির্বাচিত—কোনো সরকারের প্রধানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন নিয়ে নীরব থাকা বাধ্যতামূলক নয়। বরং জাতীয় স্বার্থে প্রয়োজনীয় সংস্কারের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরা এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জনগণের ওপর ছেড়ে দেওয়াই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ধারা।
গণভোট কোনো প্রযুক্তিগত প্রক্রিয়া নয়; এটি জনগণের সরাসরি মতামত জানানোর একটি মাধ্যম। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা যখন নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেন, তখন ভোটাররা আরও তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।
গণতান্ত্রিক বৈধতার মূল প্রশ্ন নেতারা অবস্থান নিলেন কি না, তা নয়; বরং—
ভোটাররা স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারছেন কি না
বিরোধী পক্ষ সমান সুযোগে প্রচারণা চালাতে পারছে কি না
পুরো প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কি না
সরকারের দাবি, এই শর্তগুলো বর্তমান প্রেক্ষাপটে অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্য
পোস্টে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বজুড়ে বহু দেশে সরকারপ্রধানরা গুরুত্বপূর্ণ গণভোটে প্রকাশ্যে পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ড, তুরস্ক, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে বলা হয়—এ ধরনের অবস্থানকে গণতন্ত্রবিরোধী নয়, বরং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রকাশ হিসেবেই দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এই গণভোটের ফলাফলের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো নির্বাচনী স্বার্থ জড়িত নয়। সংস্কার গৃহীত বা প্রত্যাখ্যাত হলে তার বাস্তবায়নের দায়ভার বহন করবে ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার।
উপসংহার
সরকারের মতে, এই সময় সবচেয়ে বড় ঝুঁকি সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নেওয়া নয়; বরং দ্বিধা ও নীরবতা। যে সংস্কারের দায়িত্ব নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে, তার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়াই জনগণের প্রতি জবাবদিহিতার অংশ।
শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত জনগণের হাতেই থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের মূল কথা। নেতৃত্ব সেই সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে না, বরং সচেতন ও অর্থবহ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।






















