জুলাই সনদ ও গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে নতুন বিতর্ক, বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন
জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন আদেশ ও গণভোটের চারটি প্রশ্ন নিয়ে শুরু থেকেই আপত্তি ছিল বিএনপির। বিশেষ করে উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতিসহ কয়েকটি বিষয়ে দলটি নোট অব ডিসেন্ট দেয় এবং সেই অবস্থানে অনড়ও ছিল। তবে এসব আপত্তি থাকা সত্ত্বেও গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয় বিএনপি।
সরকার গঠনের পর আবারও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ এবং গণভোটের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে দলটি। এর ফলে জুলাই আদেশ অনুযায়ী শপথ গ্রহণ কিংবা ফল ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়নি। এ পরিস্থিতিতে আদেশটির সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সরকারি দলের ভিন্নমতের কারণে গণভোটের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করছেন অনেকে।
কিছু বিশ্লেষকের মতে, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখন অনেকটাই বিএনপির রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। অন্যদিকে আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, গণভোটের প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে সরকারের ওপর আইনগত বাধ্যবাধকতা নেই।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুমের মতে, বিএনপি গণভোটের পক্ষে ছিল এবং সনদেও স্বাক্ষর করেছে। এখন সংবিধানে বিধান নেই বলে এটি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়—এমন বক্তব্যকে তিনি স্ববিরোধী ও অপ্রত্যাশিত বলে মন্তব্য করেন।
গণভোটের ফলকে জনগণের সর্বোচ্চ মতামত হিসেবে ধরা হলেও তা বাস্তবায়নের বাধ্যবাধকতা নিয়ে আইনজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ মনে করেন, সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন স্থায়ী করতে জনগণের সরাসরি মতামত প্রয়োজন। আবার অন্যরা বলছেন, সংবিধানে গণভোটের স্পষ্ট বিধান না থাকায় এর শক্ত আইনি ভিত্তি তৈরি হয়নি। এ কারণে আলাদা সংস্কার পরিষদের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন তারা।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, গণভোটের মাধ্যমে যদি এমন কোনো সিদ্ধান্ত আসে যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক—যেমন সংসদের মেয়াদ ২০ বছর করা—তাহলে তা কার্যকর করা যাবে না। এমনকি সংসদে পাস হলেও আদালতে তা বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকের মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ যে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে তা সাধারণ সংশোধনী ক্ষমতা নয়; বরং জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতার প্রতিফলন। জনগণের এই ক্ষমতার মাধ্যমে পরিবর্তন আনা হলে তা আরও স্থায়ী হবে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ কম থাকবে।
তবে বিশ্লেষকদের ধারণা, জুলাই অভ্যুত্থানের পরের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপি এই সনদ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নৈতিক চাপের মুখে থাকতে পারে। গণভোটের ভিত্তিতে আলাদা পরিষদ গঠন না হলে সংস্কারের বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া দলটির জন্য সহজ হবে না বলেও মনে করছেন তারা।
এদিকে বিএনপি তাদের নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবকে বেশি গুরুত্ব দিতে আগ্রহী। তবে অ্যাডভোকেট হাসনাত কাইয়ুম মনে করেন, জুলাই সনদে রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য আরও সুস্পষ্ট ও প্রয়োজনীয় রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, চাইলে বিএনপি বাস্তবায়ন আদেশ বা গণভোটকে আইনি চ্যালেঞ্জ করতে পারত কিংবা ‘না’ ভোটের পক্ষেও অবস্থান নিতে পারত।
পর্যবেক্ষকদের মতে, রক্তক্ষয়ী জুলাই অভ্যুত্থানের পরও যদি রাষ্ট্র সংস্কার কার্যকর না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
























