নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব: সরকারের ব্যয় বাড়লেও রাজস্ব ও মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বড় অঙ্কের বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় বেতন কমিশন। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। পাশাপাশি পেনশন ও বৈশাখী ভাতার সুবিধাও বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে বছরে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। তবে এই অর্থের জোগান কোথা থেকে আসবে, তা নিয়ে অর্থনৈতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশে ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট আটটি বেতন কমিশন গঠন করা হয়েছে। অতীত অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে গিয়ে কমিশনের সব সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি মনে করেন, অন্তর্বর্তী সরকার যে ভাতা চালু করেছিল, সেটি বজায় রেখেই প্রয়োজন হলে সীমিত আকারে বাড়ানো যেত। তার মতে, যেহেতু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেবে, তাই পূর্ণাঙ্গ পে কমিশনের সিদ্ধান্ত নির্বাচিত সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই যুক্তিযুক্ত হতো। তিনি সতর্ক করেন, ইতোমধ্যে পহেলা জুলাই থেকে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের ঘোষণা থাকায় ভবিষ্যতে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হলে প্রশাসনিক অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বেতন বৃদ্ধির জন্য সরকারকে মূলত রাজস্ব আয়ের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই, এমনকি নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, এককালীন পুরো বাস্তবায়নের বদলে কয়েক বছরে ধাপে ধাপে বেতন কাঠামো কার্যকর করা যেতে পারে। একই সঙ্গে তিনি রাজস্ব আহরণ বাড়াতে এনবিআরের কাঠামোগত সংস্কার এবং করনীতি ও করপ্রশাসনকে কার্যকরভাবে আলাদা করার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু বেতন বাড়ালেই হবে না, সরকারি চাকরিজীবীদের দক্ষতা ও যোগ্যতার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, বেতন বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই, তবে দক্ষতা মূল্যায়ন ও জনবলের চাহিদা নির্ধারণ ছাড়া এই উদ্যোগ ডিজিটাল ও আধুনিক প্রশাসন ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে না।
বর্তমানে দেশে সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ এবং পেনশনভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে এই বড় জনবল ও ব্যয়ের চাপ সামাল দেওয়াই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

























