মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে উদ্বেগে বাংলাদেশ, জ্বালানি ও বাণিজ্যে সম্ভাব্য প্রভাবের শঙ্কা
ইরানের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে খুবই কম—প্রায় ১ কোটি ডলারের মতো। তবুও ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা এবং তার পাল্টা প্রতিক্রিয়া ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া উত্তেজনা বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। কারণ এই অস্থিরতার প্রভাব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানির বড় অংশই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে। দেশের প্রায় ৯০ শতাংশ এলএনজি ওই অঞ্চল থেকেই আসে। একইভাবে পরিশোধিত জ্বালানি তেল ও ক্রুড অয়েল আমদানিতেও মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। পাশাপাশি পণ্যবাহী তেলবাহী ট্যাংকারেও হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব কারণে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হলেও বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, বর্তমান মজুত পরিস্থিতি নিয়ে এখনই উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সাবেক সভাপতি আশরাফ আহমেদের মতে, বাংলাদেশ প্রতি ছয় মাসে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের পেট্রোলিয়াম ও এলএনজি আমদানি করে, যা বছরে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের সমান। মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। এই খাতে যদি ২০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয়ের তারতম্য ঘটে, তাহলে অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ মূলত তৈরি পোশাক, কৃষিপণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য এবং হোম টেক্সটাইল রফতানি করে। এ খাতে রফতানির পরিমাণ প্রায় ৯০ কোটি ডলার। অন্যদিকে জ্বালানি তেল, এলএনজি ও খেজুরসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশকে বছরে প্রায় ৮০০ কোটি ডলার ব্যয় করতে হয়। এছাড়া ইউরোপে পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সুয়েজ খালও এই অঞ্চলের কাছাকাছি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান উত্তেজনার কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের খরচ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় আকাশপথেও পরিবহনে বিঘ্ন দেখা দিচ্ছে।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তফা কে মুজেরি বলেছেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের উন্নয়ন কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। তার মতে, এই অস্থিরতা শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভূরাজনৈতিক কারণে এর প্রভাব বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে এবং আমদানি-রফতানি কার্যক্রমেও সমস্যা তৈরি হতে পারে।
তবে রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) মনে করছে, যদি সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী না হয় তাহলে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ নেই। সংস্থাটির ভাইস চেয়ারম্যান হাসান আরিফ জানান, বাংলাদেশের শীর্ষ ২০টি রফতানি গন্তব্যের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর অবস্থান তুলনামূলক নিচের দিকে, যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। তবে রফতানির গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ অনেক সময় মধ্যপ্রাচ্যের কাছাকাছি দিয়ে যাওয়ায় অঞ্চলটির গুরুত্ব অস্বীকার করা যায় না।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি স্থানে ড্রোন হামলার কারণে এলএনজি উৎপাদন এবং কিছু তেল শোধনাগারের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে। এর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
























