আল জাজিরার বিশ্লেষণ: ট্রাম্পের সমর্থন থাকলেও কেন ধস নামছে বিটকয়েনের দামে
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন ও ক্রিপ্টোবান্ধব অবস্থানের পরও চলতি সপ্তাহে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে বৈশ্বিক ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার। বিশ্বের সবচেয়ে পরিচিত ডিজিটাল মুদ্রা বিটকয়েনের দাম নেমে এসেছে গত এক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে বিটকয়েনের মূল্য ৬৬ হাজার ডলারের নিচে নেমে যায় এবং শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) সকালে আরও কমে প্রায় ৬২ হাজার ৯০০ ডলারে দাঁড়ায়। এই দরপতনের ধারা শুরু হয়েছিল জানুয়ারির শেষ দিক থেকেই, যখন প্রথমবারের মতো দাম ৮০ হাজার ডলারের নিচে নামে।
এর আগে গত বছরের অক্টোবরে বিটকয়েন ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ১ লাখ ২৭ হাজার ডলারের বেশি দামে লেনদেন হয়েছিল। পরে ডিসেম্বরে তা নেমে আসে প্রায় ৯০ হাজার ডলারে। সর্বশেষ পতনের ফলে চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বিটকয়েনের দাম প্রায় ৩০ শতাংশ কমে গেছে। বিশ্লেষকদের প্রশ্ন—এত সমর্থনের পরও কেন এমন পরিস্থিতি?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা বিটকয়েনের দরপতনের অন্যতম বড় কারণ। ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে বিক্রির চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি স্বর্ণ ও রুপার দামের বড় ওঠানামাও ক্রিপ্টো বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
বাজার বিশ্লেষণ ও তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ক্রিপ্টোকোয়ান্ট জানায়, সাম্প্রতিক সময়ে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড বা ইটিএফগুলো, যারা গত বছর বিপুল পরিমাণে বিটকয়েন কিনেছিল, চলতি বছরে তারাই বড় অঙ্কে বিক্রি শুরু করেছে। ডয়চে ব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবরে বাজারে বড় ধসের পর থেকে প্রতি মাসেই এসব ইটিএফ থেকে বিলিয়ন ডলার করে অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে। কেবল চলতি বছরের জানুয়ারিতেই মার্কিন স্পট বিটকয়েন ইটিএফ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ বেরিয়ে গেছে।
এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বর ও ডিসেম্বরে বিনিয়োগকারীরা যথাক্রমে প্রায় ৭ বিলিয়ন ও ২ বিলিয়ন ডলার তুলে নিয়েছিলেন। ডয়চে ব্যাংক মনে করছে, এই ধারাবাহিক বিক্রি ইঙ্গিত দেয় যে প্রথাগত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ক্রিপ্টো বাজার থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, যা বাজারে হতাশা বাড়াচ্ছে।
ক্রিপ্টো বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কাইকোর পণ্য বিশেষজ্ঞ অ্যাডাম মরগান ম্যাকার্থি আল জাজিরাকে বলেন, বিটকয়েনের দামের পতনের পেছনে মূল কারণ হলো বাজারে আগ্রহ কমে যাওয়া এবং লেনদেনের পরিমাণ হ্রাস। লেনদেন কমলে বাজারে তারল্যও কমে যায়, ফলে সামান্য দরপতনও বড় প্রভাব ফেলে। তার মতে, ক্রিপ্টো বাজার অনেকটাই ‘হাইপ’-নির্ভর। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সুযোগ হাতছাড়া হওয়ার ভয় থেকেই এই হাইপ তৈরি হয়, যা বাজারকে সচল রাখে। কিন্তু সেই আগ্রহ দুর্বল হয়ে পড়লে বাজার ‘বিয়ার মার্কেট’ বা ‘ক্রিপ্টো উইন্টার’-এর দিকে চলে যায়।
এই অবস্থায় ক্রিপ্টো সম্পদের কেনাবেচা কঠিন হয়ে পড়ে এবং বিনিয়োগকারীদের কাছে তা কম আকর্ষণীয় মনে হয়। ফলে দরপতনের একটি নেতিবাচক চক্র তৈরি হয়। সাধারণত দীর্ঘ সময় ধরে দাম কমে যাওয়া বা স্থবির অবস্থাকে ‘ক্রিপ্টো উইন্টার’ বলা হয়, যার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, সুদের হার বৃদ্ধি ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ বড় ভূমিকা রাখে।
গত দুই সপ্তাহে স্বর্ণ ও রুপার বাজারেও বড় অস্থিরতা দেখা গেছে, যা ক্রিপ্টো বাজারে প্রভাব ফেলেছে। ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও ডলারের শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনায় বিনিয়োগকারীরা প্রথমে স্বর্ণ ও রুপা বিক্রি শুরু করেন। যদিও গত সপ্তাহে স্বর্ণের দাম বেড়ে প্রতি আউন্স প্রায় ৫ হাজার ৫৯৫ ডলারে পৌঁছায় এবং রুপার দাম ওঠে প্রায় ১২২ ডলারে, তবে এই উত্থান স্থায়ী হয়নি। চলতি সপ্তাহে আবারও বড় পতন দেখা যায়।
বিটকয়েনের পাশাপাশি অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সিও ক্ষতির মুখে পড়েছে। দ্বিতীয় বৃহত্তম ডিজিটাল মুদ্রা ইথারের দাম এক সপ্তাহেই প্রায় ১৯ শতাংশ কমে বৃহস্পতিবার নেমে আসে ১ হাজার ৮৫৪ ডলারে।
ট্রাম্প দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিটকয়েনের দামে দ্রুত উত্থান দেখা গিয়েছিল। বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, তার প্রশাসন আরও ক্রিপ্টোবান্ধব নীতি গ্রহণ করবে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে এক বিটকয়েন সম্মেলনে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ‘বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানী’ বানানোর ঘোষণা দেন এবং প্রেসিডেন্ট হলে বিটকয়েনের জন্য কৌশলগত রিজার্ভ গঠনের প্রতিশ্রুতি দেন।
২০২৫ সালের মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জাতীয় কৌশলগত ক্রিপ্টো রিজার্ভ গঠনের ঘোষণা দেন, যেখানে বিটকয়েন ও ইথারের পাশাপাশি এক্সআরপি, কার্ডানো ও সোলানার মতো মুদ্রাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এছাড়া ‘জিনিয়াস অ্যাক্ট’ নামে একটি আইনের মাধ্যমে স্টেবলকয়েনের নীতিমালা ও ভোক্তা সুরক্ষার কথা বলা হয় এবং ক্রিপ্টো খাতের জন্য একটি খসড়া নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রকাশ করা হয়।
তবে এসব উদ্যোগের পরও বিটকয়েন বৈশ্বিক বাজারের চাপ এড়াতে পারেনি। এর আগেও এমন পরিস্থিতি এসেছে। ২০১৭ সালের শেষে বিটকয়েনের দামের চূড়ার পর ২০১৮ সালে বড় ধস নামে এবং ২০২২ সালের নভেম্বরে এফটিএক্স কেলেঙ্কারির পর শুরু হয় আরেকটি ক্রিপ্টো উইন্টার।
কাইকোর মতে, সাম্প্রতিক দরপতন আরও তীব্র হয় যখন ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে কেভিন ওয়ারশকে নিয়োগ দেন এবং একই সঙ্গে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার ঘোষণা আসে। এই দুটি সিদ্ধান্ত মিলেই বাজারে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।
ক্রিপ্টো বাজার বিশ্লেষক হোগানের মতে, সাধারণত একটি ক্রিপ্টো উইন্টার প্রায় ১৩ মাস স্থায়ী হয়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে হতাশা ও ক্লান্তি স্বাভাবিক হলেও ক্রিপ্টোর মৌলিক ভিত্তিতে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। তার বিশ্বাস, এই ধস দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং বাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াবে।


























