পথে পথে চাঁদার বোঝা, হাটের ৩৭ টাকার বেগুন ঢাকায় ১০০
দেশের বিভিন্ন এলাকায় সবজি পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। উৎপাদন পর্যায়ে যে বেগুনের দাম কেজিতে ৩৫ থেকে ৩৭ টাকা, রাজধানীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সেটিই ১০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই বাড়তি দামের পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে ধারাবাহিক চাঁদাবাজি।
উত্তরাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ও প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো বগুড়ার মহাস্থান হাটে কৃষকরা সরাসরি সবজি নিয়ে আসেন। এখানেই নির্ধারিত হয় পাইকারি দর। প্রকারভেদে এক মণ বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায়, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ৩৫-৩৭ টাকা। শসার দামও প্রায় একই, কেজিতে ৩৫-৩৬ টাকা।
কিন্তু কৃষকের কাছ থেকে বিক্রি হওয়ার পরই শুরু হয় অতিরিক্ত খরচের চাপ। অভিযোগ রয়েছে, হাটেই প্রতি মণে ২০ টাকা করে ‘খাজনা’ নামে একটি স্লিপ ধরিয়ে টাকা নেওয়া হয়। কেউ কেউ এই খরচ এড়াতে সরাসরি ক্ষেত থেকে ট্রাকে পণ্য তোলেন। তবে সেখানেও রেহাই নেই বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
এক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, বাজারে পণ্য নামানোর খরচ যেখানে ৫০০ টাকা, সেখানে চাঁদা গুনতে হচ্ছে প্রায় ১০০০ টাকা। সবজি পরিবহনে নিয়োজিত ট্রাকচালক কাশেমের অভিযোগ, সড়কে হঠাৎ গাড়ি থামিয়ে স্লিপ দিয়ে টাকা আদায় করা হয়; না দিলে গাড়ি ছাড়ে না।
মহাস্থান হাটে শিবগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও ইজারাদার তাহেরুল ইসলামের নাম ব্যবহার করে স্লিপে টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে তিনি চাঁদার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, তার লোকজন কোনো খাজনা তোলে না; তার নাম ব্যবহার করে কেউ অপপ্রচার চালাতে পারে।
একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জেও। সেখানে ব্যবসায়ী ও ট্রাকচালকদের কাছ থেকে স্লিপের মাধ্যমে টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। এটি সমঝোতার ভিত্তিতে আদায় করা হচ্ছে কি না—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জের জেলা প্রশাসক আমিনুল ইসলাম বলেন, চাঁদাবাজির কোনো সুযোগ নেই এবং এ ধরনের অভিযোগ কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে জানাননি। তার বক্তব্য, রাস্তায় কেউ অবৈধভাবে টাকা তুললে সেটি চাঁদাবাজি হিসেবেই বিবেচিত হবে এবং তা বন্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পথপর্যায়ে আরও দেখা যায়, সিরাজগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী ট্রাক গাজীপুর এলাকায় পৌঁছালে সেতুর অজুহাতে ট্রাকপ্রতি ২০০ টাকা নেওয়া হয়। কখনও সড়ক ও জনপদের টোলের নামেও বিভিন্ন স্থানে ম্যানুয়ালি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
সবশেষে ঢাকার পাইকারি আড়তে এসে আড়তদাররা নগরবাসীর জন্য মূল্য নির্ধারণ করেন। পরিবহনের পুরো পথে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ফলে সবজির দাম দুই থেকে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—হাট থেকে মহাসড়ক পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে চাঁদাবাজি কি আদৌ কমেছে? ‘সমঝোতার টাকা’ নামে যাই বলা হোক, তার প্রভাব যে পণ্যমূল্যে পড়ছে, তা নিয়ে সংশয় নেই বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।




















